ফ্যান

0
51

স্যা…….চিন   স্যা……চিন ।

স্যা…….চিন   স্যা……চিন ।

মাঠের দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ব্যাট হাতে প্রবেশ বছর তেরো র ছেলেটির । ব্যাট শুরূ করার আগে শেষ বার  পিছন ফিরে সচিন টেন্ডুলকার এর ভঙ্গিতেই একটু দেখে নেয় নিজের সমর্থক দের ।সমর্থক গোটা বিশেক হবে । অনুর্ধ তেরো টুর্নামেন্ট এর আজ ফাইনাল । সুভাষ গ্রাম একাদশ বনাম শতদল একাদশ ।টস জিতে সুভাষ গ্রাম একাদশের ব্যাটিং আর শুরুতেই বিপর্যয় ।টেনিস বলে দাড়িয়ে খেলায় প্রথম পাঁচ বলের মধ্যে মাত্র দুই রান আর তাতে দুই উইকেট ।অবশেষে ব্যাটিং এর পালা রুপম এর ।যাকে সুভাষ গ্রাম এর এগারোর পল্লী তে বন্ধুরা “সচিন ” বলে ডাকে ।।আজ ও তারা ই ওকে সমর্থন দিচ্ছে ।পুরো টুর্নামেন্ট এ ওর অসাধারণ ব্যাটিং দেখেছে এই টুর্নামেন্ট যা আজ চূড়ান্ত রূপ নিতে চলেছে ।ক্লাব ঘরে সুযোগ পেলেই সচিন এর খেলার হাইলাইটস  গুলো দেখতে থাকে রুপম । খুব নজর রাখে ওর ব্যাটিং ,হাঁটা চলা ,ব্যাট উপরের দিকে দেখানো , কভার এ ওর শট গুলো ।বা স্ট্রেট ড্রাইভ ।কিন্তু কভারে শট মারতে গিয়ে ও অনেক বার আউট হয়েছে ।যাই হোক , ক্রিজে এসে দাড়িয়েছে ছোট সচিন ।পা টা মাপ মত ঘষে নিয়ে ব্যাট টা রেখে দেখে নেয় ।তারপর একটু শ্যাডো ।একটু হাঁটু দুটো ভাঁজ করে অর্ধেক বসার ভঙ্গি করে আবার উঠে দাড়ায় ॥

ঠিক তিন থেকে চার ওভারের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং এ একটু ভালো জায়গায় পৌছায় সুভাষ গ্রাম একাদশ এর স্কোর ।।আর হাতে তিন ওভার ।শুরূ হয় ছোট্ট সচিন এর জাদু ।কভার নয় ,ঠিক মত সময় করে ,নিজেকে ক্রিজে গুছিয়ে নিয়ে লং অনের দিকে ছয় , মিড অন এ চার , অথবা একেবারে বোলারের মাথা র উপর দিয়ে চার ।আট ওভার শেষে সুভাষ গ্রাম একাদশের স্কোর পাঁচ উইকেটে বাহাত্তর ।তার মধ্যে রুপম এর নিজের সাতাশ বল খেলে একচল্লিশ অপরাজিত ।

সুভাষ গ্রাম একাদশের ধারালো বোলিংয়ের এর জেরে প্রতিপক্ষ বাহান্ন রানেই ধরাশায়ী ।টুর্নামেন্ট এর সেরা খেলোয়াড় রুপম ।

বাড়ী ফিরে এসে রুপম নিজের মেডেল টা নিজের গুরুদেব এর ছবির পাশে রেখে দেয় ।আর ভাবতে থাকে ,যদি সেই বারে ওর গুরুদেবের মত ও যদি আজকের মত ম্যাচে তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যেত তাহলে কি হত ? “যাক গে , ম্যাচ তো জিতেছি ।”

বলেই নিজের পাতলা এম.আর.এফ  এর স্টিকার লাগানো ব্যাট টা আকাশের দিকে তুলে দেখালো ।রুপম শুনেছিল ওর গুরুদেব নাকি ওনার মৃত বাবা কে   এভাবে নিজের সেঞ্চুরি উত্সর্গ করেন ।ঠিক সেরকম ভাবেই রুপম নিজের মৃত বাবা কে স্মরণ করলো ।ইসস্ আরে ছি ছি । একি করছে রুপম ।ওই মাতাল লোক টা কে নিজের খেলা কোনোদিন উত্সর্গ করবেনা ।গেছে ভালোই হয়েছে ।শুধু এই কাজ টা সে তার গুরুদেব এর মত করবে না ।ব্যাট নিয়ে আবার শুরূ হয় রুপম এর শ্যাডো প্রাকটিস ।

একটু পর ক্লাবে যাবে, আজ আর কেউ কিছু বলবেনা ওকে ।ক্লাবের দাদারাই বলেছে এবার থেকে রোজ ওকে সচিন এর খেলা দেখতে দেবে ।রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দুহাত মুঠো করে স্ট্রেট ড্রাইভ টা আর একবার সেরে নেয় রুপম । ক্লাবে বসে বসে দেখতে থাকে সে তার ঈশ্বর কে । আর মনে মনে তার একটাই কথা ভেসে আসে ,

“তু সির্ফ এক প্লেয়ার নাহি , দুনিয়া হ্যায় মেরা ।”- কোনো এক ফিল্ম এর ডায়লগ হবে হয়তো ।

রুপম ছেলেটি আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান নয় ।বাপ হারা এক গরীব পরিবারের ছেলে ।ক্রিকেট খেলার জন্য দামী ব্যাট ,প্যাড ,গ্লাভস এসব তো দূর , ভাত ও দুবেলা খেতে হয় খুব হিসেব করে ।তার গুরুদেব তাদের থেকে একটু দুরে কলকাতার মাঠে খেলে গেছেন তাও জানা রুপমের ।কিন্তু টিকিটের টাকা দেওয়ার মত লোক নেই ।

দিনের পর দিন যায় ,মাসের পর মাস ।বছরের পর বছর ।রুপম দেখেছে তার গুরুদেবের সাথে কখনো তুলনা হচ্ছে কোনো অস্ট্রেলিয় ব্যাটসম্যান এর ,কখনো বা কোনো শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান ।কখনো খুব রাগ হয় যখন কেউ তার ঈশ্বর কে “বুড়ো হয়ে গেছে এখনো খেলছে ” বলে । এই জন্য তো একদিন সুমিত এর সাথে ওর মারপিট হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা ।বাড়ী ফিরে কাদতে থাকে রুপম শুধু ।তার কষ্ট হয় যখন কেউ ওনাকে এরকম বলে ।এখন আবার কোন নতুন একজন ব্যাটসম্যান এর সাথে ও তার তুলনা হয় ।বিরাট কোহলি ।কিন্তু এরা কেউ বোঝেনা ,যে উনি সব তুলনার ঊর্ধ্বে ।দেখতে দেখতে রুপমের আজ কুড়ি বছর বয়স ।আজ আবার ফাইনাল ।সুভাষ গ্রাম একাদশ বনাম আবার শতদল একাদশ । আজ দ্বিতীয়  ব্যাটিং সুভাষ গ্রামের ।এক উইকেট পতনের পর মাঠে রুপমের ।শুধু পিছনে সমর্থকদের মুখের নাম টা পাল্টে গেছে ।

“বিরাট  বি…. রাট ।”

“বিরাট  বি… রাট   ।”

খেপে গেলো রুপম ।এগিয়েই গেলো নিজের বন্ধু গুলোর দিকে । “শুধু আমার গুরুদেবের নাম নে ।আর কারোর নয় ।ওনার নামের মধ্যেই কিছু একটা আছে ।যা অন্য কারোর নামে নেই ।।”

পাড়ার সন্মান বাঁচাতে পারলে ওই বাঁচাতে পারবে এটা বুঝতে পেরে সবাই রুপমের কথা মত “স্যা…চিন

স্যা…চিন ” চিত্কার শুরূ করলো ।ঠিক সাত বছর আগে রুপম এই ম্যাচ জিতিয়েছিল নিজ ব্যাটিং এর জোরে ।।আজও তাকে ঠিক তেমন করতে হবে ।বিয়াল্লিশ বলে এখনো সত্তর রান চাই তার ।কিন্তু তার মনে আজ ঝড় চলছে ।ঈশ্বর বলেছেন এবার খেলা ছাড়বেন ।কয়েকদিন পর ইডেনে তার খেলা আছে ।তার  ১৯৯ তম টেস্ট ।আরো তার কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে তার আর এই জীবনে ঈশ্বর কে দেখার ভাগ্য হলোনা ।কিন্তু রুপম সেদিন খেলল ।তার অনবদ্য আটচল্লিশ রানের ইনিংসে ভর করে তার দল জিতল ছয় উইকেটে ।সে খেললে জয় আসবেই ।কিন্তু তারপরের পুরস্কার টা যে এমন হবে সে কখনো ভাবতে পারেনি । টুর্নামেন্ট এর সেরা হিসেবে সে ট্রফি তো নিলো সাথে পেলো এক চমকপ্রদ অফার ।সেই টুর্নামেন্টে উপস্থিত এক সি.এ.বি কর্তা তার ব্যাটিং এ মুগ্ধ হয়ে তাকে ডাকলেন নিজের ট্রেনিং ক্যাম্পে।যেখানে তিনি ট্রেনিং করাবেন রুপম কে ।আর তারপর হয়তো রুপম তার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাবে । তবে শেষ এখানেই নয় , রুপম এর আনন্দের বাঁধ ভাঙ্গে তখন , যখন পুরস্কার স্বরূপ তার হাতে তুলে দেওয়া হয় , ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচের টিকিট ।তার ঈশ্বরের একশ নিরানব্বই তম ম্যাচের টিকিট ।

রুপম এর চোখের  জল আর আটকানো যায়নি ।মাঠেই বসে পড়ে রুপম ।কখনো হাসছে ,কখনো কাঁদছে ।দলের অন্যান্য রা তাকে কাঁধে তুলে নেয় ।এ যেনো ঠিক তার মতই অবস্থা ।তিনি যেমন আজীবন ভারত কে বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন আর  ২৮বছর পর তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ,এ ও যেনো ঠিক তেমন ।যুবরাজ সিং , বিরাট কোহলি যেমন তাকে কাঁধে চড়িয়ে পুরো মাঠ দৌড়েছিলো , রুপম এর ও যেনো ঠিক তেমন ই মনে হচ্ছে । রুপম জানে ,খেলোয়াড় অনেক আসবে অনেক যাবে ,কিন্তু  ভগবান সবসময় আমাদের উপরেই থাকেন ।এক নবাব মার্কা হাসি খেলে যায় রুপম এর ঠোঁটের কোণে ।টিকিট টা ভাঁজ করে অতি যত্নে সে নিজের পকেটে রেখে দেয় ।

Leave a Reply