বিরিয়ানি -3

0
265

বিরিয়ানি ব্যপারটা সবারই প্রিয় ।সে দক্ষিণ কলকাতার আর্সেলানের হোক ,বা রাস্তার পাশে ষাট টাকার বিরিয়ানি ।পকেটে টাকা না থাকলে সেই গন্ধ পেট ভরে  নিঃশ্বাসের সাথে সবাই টেনে নেয় ।আমিও ।আর টাকা থাকলে গরম গরম আলু ,মুরগির ঠ্যাং ,মশলা মাখানো চাল টা মুখে যেতে কতক্ষণ ?আমার এই স্বভাবের জন্য আমাকে একটা ভয়ংকর মেয়ের পাল্লায় পড়তে হয়েছে ।তারপর তার সাথে বিয়ে হয়েছে যেখানে অনেক ঝামেলার পর বিরিয়ানি রাখতে হয়েছে মেনু তে ,তারপর শ্বশুরের সঙ্গে সেই নিয়ে ঠান্ডা লড়াই ।জীবনে অনেক কিছু সহ্য করেছি এই বিরিয়ানির জন্য ।কিন্তু আমার সাথে যে এই ঘটনাও ঘটবে ,জানা ছিলো না ।

ছোটখাটো ব্যপারে প্রিয়ার সাথে ঝামেলা আমার লেগেই থাকে ।যখন একে অপরকে মানানোর দরকার পড়ে ,তখন সেই কাজ টা করে বিরিয়ানি ।আমি প্রিয়া কে বিরিয়ানি কিনে খাওয়াই ,আর ও বানিয়ে ।এখন ঝামেলার কারণ ছেলে এবং তার পড়াশোনা ।ছেলের বয়স এখন মাত্র সাত ।কিন্তু এই অল্প বয়সেই আমার স্ত্রী আবিষ্কার করলেন ,আমাদের ছেলের দ্বারা পড়াশোনা হবেনা ।রোজ ওকে পড়াতে বসে পড়া বোঝাতে বোঝাতে মারা ,বা পড়া বলতে না পারলে চর থাপ্পড় এসব চলত ।আমি ছিলাম এর ঘোর বিরোধী ।প্রথম কথা ,এটুকু বয়সেই বোঝা যায়না ,সে বড় হয়ে আইজ্যাক নিউটন হবে নাকি ,মুম্বাই এর ডন হাজী মস্তান ,যে কিনা ওই ফিল্মের মতো বলবে ,”দুয়া মে ইয়াদ রাখনা ।”আর দ্বিতীয় কথা ,ছেলেকে পড়াশোনার ব্যপারে এই বয়সেই এতো চাপ দিলে ও এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে ।ভয় পাবে ।সহ্য করছিলাম এই ব্যপার গুলো ।রাগ হলো সেইদিন যেদিন প্রিয়া ওকে গালে একটা কষিয়ে চর মারলো ।খুব রাগ হয়েছিলো ।ঘরে ঢুকে বই খাতা সব ছুড়ে ফেলে দিলাম ।আমি বই পত্র ফেলে দেওয়া কে সমর্থন করিনা কিন্তু সেদিন রাগ টা কিছুতেই বশে ছিলো না ।সাথে অনেক ঝগড়া ।অনেক কথা কাটাকাটির পর আমার আর প্রিয়ার কথা বলা বন্ধ ।দেখি প্রিয়া এখন ছেলেকে কিছু বলেও না ।আমিও নিজের জেদ চেপে রইলাম ।মাঠের ধার দিয়ে আসার পথে ছেলেকে খেলতে দেখলেও প্রিয়া এখন কিছু বলেনা ।ঘরে এখন বিরিয়ানিও হয়না ।আমিও আর বাইরে থেকে বিরিয়ানি কিনে আনি না।এরকম একদিন বিকেলের দিকে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার ছেলেকে দেখলাম ।ছেলের নাম শখ করে রেখেছিলাম সুন্দর ।সুন্দর কে দেখলাম ।কিছু বড় বড় ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলছে ।বাকিদের বয়স এগারো বারো হবে ।সুন্দরের হাতে বল ।একটা ওভার দেখলাম ওর ।সম্ভবত ওটাই ম্যাচের লাস্ট ওভার ।লাস্ট ওভারে নয় রান দরকার ।ছোড়া বলে ছয় মারা খেলা ।আমরা যারা ছোটবেলায় বা এখন ক্রিকেট খেলি তারা সবাই জানি ,এটা খুব একটা কঠিন ব্যপার নয় ।প্রথম বলে লেগে ফুলটস বল পেয়ে ছক্কা হাঁকালো ব্যাটসম্যান ।বাকী পাঁচ বলে তিন রান দরকার ।আমার খুব অবাক লাগলো এটা দেখে যে ম্যাচের এই সময় সুন্দরের হাতে বল দেওয়া কেনো ?যেখানে ম্যাচের শেষ দুটো ওভার করতে হয় দলের সবথেকে ভালো বোলার কে ।যদিও বাচ্চাদের খেলা ।ভুল থেকেই শিখবে ।পরের দুটো বল দেখার পর বুঝলাম সুন্দরই হয়তো ওর দলের সবথেকে ভালো বোলার ।দ্বিতীয় বলটা নিখুঁত ইয়র্কার ব্যাটসম্যানের পায়ে ।তারপরের বল টা ওয়াইড ইয়র্কার ।অর্থাত্ একেবারে দাগ ঘেষে অফে ইয়র্কার ।বাকী তিন বলে তিন রান ।পরবর্তী বলে একটা সিঙ্গল ।তারপর দুই বলে লাগবে দুই রান ।তারপরের বল আবার ব্যাটসম্যানের অফ সাইডে ।কিন্তু ইয়র্কার নয় ।স্লোয়ার ।।বুঝতে না পেরে ক্যাচ আউট ।তারপর শেষ বলে চাই দুই রান । গতিতে আসা শর্ট বল বুঝতে না পেরে ব্যাট চালাতে গিয়ে থার্ড ম্যানের হাতে ক্যাচ ।সুন্দরের এই সুন্দর ওভার টা আমাকে ওইদিন খুব অবাক করেছিলো ।দুইদিন পর ওকে আমি নিয়ে গেলাম স্থানীয় ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ।এই প্রথম প্রিয়ার কোনো মতামত নিলাম না ।টানা দুই মাস কোচিং এর পর একটা টুর্নামেন্টে সুন্দরের খেলার ডাক পড়লো ।ঘরে লিখিত ভাবে (মুখে কথা বলা বন্ধ তাই ) প্রিয়া কে জানালাম সুন্দরের টুর্নামেন্টের কথা ।আর যদি ও দেখতে যেতে রাজি হয় তাহলে আমার সাথে যেতে পারে ।এটা স্বাভাবিক যে ও আমার সাথে যাবেনা ।সেটা ও লিখিত জানিয়েছিলো ।কিন্তু এটা জানতাম না যে মাঠে ও আমার আগে উপস্থিত থাকবে ।সেই ম্যাচে সুন্দরের পারফরমেন্স সবার নজর কেড়েছিল ।কুড়ি ওভারের ম্যাচে সুন্দরের পরিসংখ্যান ৪-১৭-১-৩।ওর ওই দামী তিন উইকেটের উপর ভর করেই ম্যাচ জিতলো সুন্দরের দল ।কারণ রান খুব একটা ছিলো না ।প্রিয়া যেমন মাঠে আগে উপস্থিত হয়েছিলো ,তেমনি মাঠ থেকে আমার আগেই বেরিয়েছিলো ।ঘরে ফিরে দেখি দুই প্লেট গরম বিরিয়ানি ,মুরগির ঠ্যাং ,এবং গরম গরম খাসির মাংস অপেক্ষা করছে টেবিলে ।পাশে দুটো কার্ড ।তাতে লেখা সরি ।প্রিয়াকে রান্নাঘর থেকে রীতিমত কোলে তুলে টেবিলে খেতে বসালাম ।এই দেখে সুন্দর ফিক ফিক করে হেসে উঠলো ।লজ্জা পেলো প্রিয়াও ।ও ও হাসতে শুরূ করলো ।আমি আর ওদের হাসি থামার অপেক্ষা করতে পারছিলাম না ।নিজের খাওয়া শুরূ করলাম ।খেতে খেতে সুন্দর বললো ,”আমি দাহীর খানের মতো বল কলি না মা ?”(ও একটু ওই ভাবে কথা বলে ।ছোটো তো ।)

প্রিয়া বলল ,”না বাবা ,তুই একেবারে সুন্দরের মতো সুন্দর বল করিস ।”

Leave a Reply